অনেক সময় সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখের পাতা ফুলে যাওয়া, কয়েক দিনের মধ্যে পা বা গোড়ালি ফুলে যাওয়া, হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া কিংবা প্রস্রাবে অতিরিক্ত ফেনা দেখা—এসব লক্ষণকে অনেকেই সাময়িক সমস্যা মনে করে অবহেলা করেন। কিন্তু এগুলো নেফ্রোটিক সিনড্রোমের লক্ষণ হতে পারে, যা কিডনির একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।
নেফ্রোটিক সিনড্রোমে কিডনির ছাঁকনি (Glomerulus) ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অতিরিক্ত প্রোটিন প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে যায়। এর ফলে শরীরে প্রোটিনের ঘাটতি তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়।
নেফ্রোটিক সিনড্রোমের প্রধান লক্ষণ
১. শরীর ফুলে যাওয়া (Edema)
এটি নেফ্রোটিক সিনড্রোমের সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ।
প্রথমে সাধারণত চোখের পাতা, বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর ফোলা দেখা যায়। পরে ধীরে ধীরে—
পা ও গোড়ালি
পায়ের পাতা
হাত
মুখমণ্ডল
অণ্ডথলি (পুরুষদের ক্ষেত্রে)
এমনকি পুরো শরীরেও পানি জমতে পারে।
অনেক রোগীর ক্ষেত্রে পেটেও পানি জমতে পারে (Ascites)।
২. প্রস্রাবে অতিরিক্ত ফেনা
প্রস্রাবে অতিরিক্ত প্রোটিন বের হলে প্রস্রাবে অনেক সময় স্থায়ী ফেনা দেখা যায়। যদিও সব ফেনাযুক্ত প্রস্রাব নেফ্রোটিক সিনড্রোম নির্দেশ করে না, তবে দীর্ঘদিন ধরে এমন হলে অবশ্যই পরীক্ষা করা উচিত।
৩. হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া
শরীরে অতিরিক্ত পানি জমার কারণে কয়েক দিনের মধ্যেই ওজন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। অনেকেই এটিকে মোটা হয়ে যাওয়া মনে করলেও প্রকৃতপক্ষে এটি শরীরে তরল জমার ফল।
৪. প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া
কিছু রোগীর ক্ষেত্রে প্রস্রাবের পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় কমে যায়। বিশেষ করে শরীরে পানি জমার মাত্রা বেশি হলে এই লক্ষণটি দেখা দিতে পারে।
৫. দুর্বলতা ও সহজে ক্লান্ত হয়ে পড়া
রক্তে অ্যালবুমিন কমে গেলে শরীর দুর্বল লাগে, কাজ করার শক্তি কমে যায় এবং রোগী দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়েন।
৬. ক্ষুধামন্দা
অনেক রোগীর খাওয়ার আগ্রহ কমে যায়। শরীরে পানি জমা এবং কিডনির সমস্যার কারণে বমি বমি ভাবও হতে পারে।
৭. শ্বাসকষ্ট
শরীরে অতিরিক্ত পানি জমে ফুসফুসের চারপাশে তরল জমলে শ্বাস নিতে কষ্ট হতে পারে। এটি অপেক্ষাকৃত গুরুতর লক্ষণ এবং দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
৮. উচ্চ রক্তচাপ
সব রোগীর ক্ষেত্রে না হলেও অনেকের রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে, বিশেষ করে যদি কিডনির ক্ষতি আরও বেশি হয়।
শিশুদের ক্ষেত্রে নেফ্রোটিক সিনড্রোমের লক্ষণ
শিশুদের মধ্যে লক্ষণগুলো কিছুটা ভিন্নভাবে প্রকাশ পেতে পারে। যেমন—
সকালে চোখের পাতা ফুলে যাওয়া
মুখমণ্ডল ফুলে যাওয়া
পেট ফুলে যাওয়া
খেলাধুলায় অনীহা
দুর্বলতা
ক্ষুধামন্দা
ঘন ঘন সংক্রমণ
শিশুর চোখ ফোলা মানেই অ্যালার্জি বা ঘুম কম হওয়া নয়। যদি ফোলাভাব বারবার হয়, তাহলে অবশ্যই কিডনির মূল্যায়ন করা উচিত।
নেফ্রোটিক সিনড্রোমের লক্ষণ দেখা দিলে কী করবেন?
উপরের এক বা একাধিক লক্ষণ থাকলে নিজে নিজে ওষুধ খাওয়া উচিত নয়। কারণ একই ধরনের লক্ষণ হৃদরোগ, লিভারের রোগ বা অন্যান্য কিডনি রোগেও দেখা দিতে পারে।
সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো জরুরি। যত দ্রুত কারণ নির্ণয় করা যায়, তত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব এবং জটিলতার ঝুঁকিও কমে।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার দৃষ্টিভঙ্গি
হোমিওপ্যাথিতে নেফ্রোটিক সিনড্রোমের ক্ষেত্রে শুধু শরীর ফুলে যাওয়া বা প্রস্রাবে প্রোটিনের পরিমাণ নয়, রোগীর সম্পূর্ণ শারীরিক ও মানসিক লক্ষণ, রোগের কারণ, অগ্রগতি এবং ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হয়। দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে নিয়মিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভিডিওতে বিস্তারিত দেখুন
YouTube ভিডিও:
এই বিষয়ে বিস্তারিত পড়ুন
নেফ্রোটিক সিনড্রোম (Nephrotic Syndrome): কারণ, লক্ষণ, পরীক্ষা, প্রতিরোধ ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা
সম্পর্কিত নিবন্ধ
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
নেফ্রোটিক সিনড্রোমের প্রথম লক্ষণ কী?
অনেক রোগীর ক্ষেত্রে সকালে চোখের পাতা ফুলে যাওয়া এবং প্রস্রাবে অতিরিক্ত ফেনা দেখা যাওয়াই প্রথম লক্ষণ হতে পারে।
নেফ্রোটিক সিনড্রোমে কি সব সময় শরীর ফুলে যায়?
বেশিরভাগ রোগীর ক্ষেত্রে শরীর ফুলে যায়, তবে রোগের শুরুতে ফোলাভাব খুব সামান্যও হতে পারে।
প্রস্রাবে ফেনা মানেই কি নেফ্রোটিক সিনড্রোম?
না। প্রস্রাবে ফেনা হওয়ার বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তবে দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত ফেনা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পরীক্ষা করা উচিত।
নেফ্রোটিক সিনড্রোম কি গুরুতর রোগ?
এটি একটি গুরুতর চিকিৎসাযোগ্য অবস্থা। সময়মতো রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা না হলে কিডনির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি এবং অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে।