নেফ্রোটিক সিনড্রোম (Nephrotic Syndrome) কোনো একক রোগ নয়; বরং এটি এমন একটি অবস্থা, যেখানে কিডনির ছাঁকনি (Glomerulus) ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে অতিরিক্ত পরিমাণে প্রোটিন প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে যায়। এর ফলে শরীরে পানি জমে যাওয়া, রক্তে অ্যালবুমিন কমে যাওয়া, কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে।
অনেকেই জানতে চান, নেফ্রোটিক সিনড্রোমের কারণ কী? এর উত্তর এক কথায় দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এর কারণ এক নয়, আবার অনেক সময় এটি কিডনির নিজস্ব রোগের কারণে হয়, আবার কখনও অন্য কোনো শারীরিক রোগের জটিলতা হিসেবেও দেখা দেয়।
নেফ্রোটিক সিনড্রোম কেন হয়?
আমাদের কিডনির ভেতরে লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র ছাঁকনি রয়েছে, যেগুলো রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ছেঁকে প্রস্রাব তৈরি করে। স্বাভাবিক অবস্থায় এই ছাঁকনি শরীরের গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনকে রক্তে ধরে রাখে।
কিন্তু যখন এই ছাঁকনিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন প্রোটিন প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে যেতে শুরু করে। এই অবস্থাই নেফ্রোটিক সিনড্রোমের মূল ভিত্তি।
নেফ্রোটিক সিনড্রোমের প্রধান কারণ
১. কিডনির নিজস্ব রোগ (Primary Glomerular Disease)
অনেক রোগীর ক্ষেত্রে সমস্যার মূল উৎস কিডনির ছাঁকনির মধ্যেই থাকে। এসব অবস্থায় কিডনি সরাসরি আক্রান্ত হয় এবং অতিরিক্ত প্রোটিন প্রস্রাবে বের হতে শুরু করে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
- Minimal Change Disease
- Focal Segmental Glomerulosclerosis (FSGS)
- Membranous Nephropathy
বিশেষ করে শিশুদের নেফ্রোটিক সিনড্রোমের অন্যতম সাধারণ কারণ হলো Minimal Change Disease।
২. ডায়াবেটিস
দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস কিডনির সূক্ষ্ম রক্তনালী ও ছাঁকনিকে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ফলে Diabetic Kidney Disease তৈরি হতে পারে, যা পরবর্তীতে নেফ্রোটিক সিনড্রোমের কারণ হতে পারে।
৩. উচ্চ রক্তচাপ
দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ থাকলে কিডনির ক্ষুদ্র রক্তনালীগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। ধীরে ধীরে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং কিছু রোগীর ক্ষেত্রে নেফ্রোটিক সিনড্রোম দেখা দিতে পারে।
৪. অটোইমিউন রোগ
কিছু রোগে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত নিজের কিডনিকেই আক্রমণ করে। এর ফলে কিডনির ছাঁকনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উদাহরণ হিসেবে—
- Systemic Lupus Erythematosus (SLE)
- IgA Nephropathy-এর কিছু জটিল অবস্থা
৫. সংক্রমণ
কিছু দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণও কিডনিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। যেমন—
- হেপাটাইটিস বি
- হেপাটাইটিস সি
- এইচআইভি সংক্রমণ
- কিছু দীর্ঘস্থায়ী ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ
এসব অবস্থায় নেফ্রোটিক সিনড্রোমের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
৬. কিছু ওষুধ
দীর্ঘদিন বা অনিয়ন্ত্রিতভাবে কিছু ওষুধ ব্যবহার করলে কিডনির ক্ষতি হতে পারে।
যেমন—
- কিছু ব্যথানাশক ওষুধ (NSAIDs)
- কিছু অ্যান্টিবায়োটিক
- কিছু ক্যানসারের ওষুধ
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ওষুধ সেবন করলে কিডনির ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ে।
৭. বংশগত বা জন্মগত কারণ
কিছু শিশুর ক্ষেত্রে জন্মগত জিনগত সমস্যার কারণে কিডনির ছাঁকনি ঠিকভাবে গঠিত হয় না। ফলে খুব অল্প বয়সেই নেফ্রোটিক সিনড্রোম দেখা দিতে পারে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন?
নিচের ব্যক্তিদের নেফ্রোটিক সিনড্রোম হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি—
- দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস রোগী
- দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপের রোগী
- অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি
- দীর্ঘস্থায়ী ভাইরাল সংক্রমণ রয়েছে এমন রোগী
- পরিবারে কিডনি রোগের ইতিহাস আছে এমন ব্যক্তি
- দীর্ঘদিন চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ ব্যবহারকারী
কারণ জানা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সব নেফ্রোটিক সিনড্রোমের চিকিৎসা একরকম নয়। কারও ক্ষেত্রে এটি সাময়িক সমস্যা, আবার কারও ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের লক্ষণ হতে পারে। তাই শুধু প্রস্রাবে প্রোটিন পাওয়া গেলেই চিকিৎসা শুরু না করে, নেফ্রোটিক সিনড্রোমের কারণ নির্ণয় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ সঠিকভাবে শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসা পরিকল্পনা, রোগের ভবিষ্যৎ অবস্থা এবং জটিলতা প্রতিরোধ—সবকিছুই অনেক বেশি কার্যকর হয়।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার দৃষ্টিভঙ্গি
হোমিওপ্যাথিতে নেফ্রোটিক সিনড্রোমকে কেবল একটি পরীক্ষার রিপোর্ট হিসেবে নয়, বরং রোগীর সামগ্রিক শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্য, রোগের কারণ, অগ্রগতি এবং ব্যক্তিগত লক্ষণ বিশ্লেষণ করে মূল্যায়ন করা হয়। দীর্ঘস্থায়ী কিডনি সমস্যায় স্ব-চিকিৎসা না করে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত মূল্যায়ন ও চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ভিডিওতে বিস্তারিত দেখুন
YouTube ভিডিও: